মেনু নির্বাচন করুন

ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ ও খেজুরের রস

এলাঙ্গী ইউপির বিভিন্ন গ্রামে খেজুর গাছ বিদ্যমান রয়েছে। খেজুর গাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে খেজুরের রস পাওয়া যায়। খেজুরের রস থেকে খেজুরের গুড় পাওয়া যা্য়। খেজুরের গুড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরী হয়। শীতের সকালে খেজুরের রস খেতে ভীষণ মজা।

শীতের সকালে আবছা আলোয় প্রকৃতি থাকে ভেজা, এক চুমুক খেজুরের রস প্রাণকে করে তাজা। ঋতুবৈচিত্র্যের পালাক্রমে চলছে শীত। নানা রকম খাবার, ফুল-ফল,সবজি ও পিঠা পুলির আমেজ নিয়ে হাজির হয় শীতকাল। শীতকালীন খাদ্য তালিকায় প্রথমেই আসে অতিপ্রিয় খেজুরের রস।

কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালটা যেনও খেজুরের রস  ছাড়া জমেই না। শীত ও খেজুরের রস যেনও ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। রস হচ্ছে খেজুরের গাছ থেকে আহুত মুখোরোচক পানীয় । সকালবেলার ঠান্ডা, মিষ্টি খেজুরের রস যেনও অমৃত।

বাংলা আশ্বিন মাস থেকে সাধারণত রস সংগ্রহ শুরু। তবে পৌষ ও মাঘ মাসে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়, কারণ এই দুই মাসে শীতের প্রকোপ থাকে সবচেয়ে বেশি। আবহাওয়া যত ঠান্ডা থাকে রসও তত বেশি পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে আর রসও কমতে থাকে।

শীতের সকালে সূর্যি মামা উঁকি দেওয়ার আগেই গাছিরা গাছ থেকে রসের হাড়ি নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রস নিয়ে পাড়ি জমায় দূর-দূরান্তের হাট-বাজারে। রস কিনতে অনেক লোকের সমাগম দেখা যায় রসের হাঁটে। কুয়াশা ঘেরা সকালে গাছিদের কাঁধে করে হাঁড়ি ভরা রস নিয়ে যাওয়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আমার মনে হয় গ্রামীণ বাংলাদেশ ছাড়া আর পৃথিবীর কোথাও হয়তো দেখাই যায় না। মনে করিয়ে দেয় রং তুলিতে আঁকা শিল্পীর এক মনোরম চিত্রকর্মের কথা।

শীতের সকালে গাছ থেকে নামানো কাঁচা রসের স্বাদ যেমন বর্ণনা করা সম্ভব নয়, তেমনি জ্বাল করা রসের তৈরি বিভিন্ন খাবারের স্বাদ ও চাহিদাও অনেক। কুয়াশা মাখা সকালবেলায় রসের তৈরি পায়েসের গন্ধে মু মু করে চারিদিক। সেই মিষ্টি গন্ধে মানুষের সাথে যেন পিপড়া-মাছিরও ঘুম হারাম হয়ে যায় একটু স্বাদ আস্বাদনের তাগিদে। কারো কাছেই আয়োজন উৎসের গোপনীয়তা থাকে না।
খেজুরের রসের পাটালি গুড়েরও বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে বাংলার ঘরে ঘরে। এই গুড় দিয়ে হরেক রকম পিঠা বানায় গাঁয়ের বঁধুরা । ভাপা, সিদ্ধপুলি, মালপোয়া, লালুয়া, রসের চিতইয়ের মতো বহু রকম পিঠা। আর এই পিঠা বানানো ঘিরে শিশু-বৃদ্ধার বসে থাকার দৃশ্য বাংলার এক পুরোনো সংস্কৃতিরই অংশ। মনে হয় শীত যত বেশি, তাদের পিঠা খাওয়ার তৃপ্তি, আনন্দও তত বেশি। এরূপ দৃশ্যকে কবি সুফিয়া কামাল যেভাবে চিত্রায়িত করেছিলেন -

পৌষ পর্বণে পিঠে খেতে বসে 
খুশিতে বিষম খেয়ে।
বড় উল্লাস বাড়িয়াছে মনে
মায়ের বকুনি খেয়ে।

বাংলাদেশের খেজুর গাছের প্রধান আকর্ষণ খেজুরের রস। যে খেজুর হয় তার শাঁস খুব কম হওয়ায় এটা নিয়ে কারো তেমন কোনো আগ্রহ নেই। একটি খেজুর গাছের রস দেওয়ার উপযুক্ত হতে ১০-১৫ বছর সময় লাগে এবং ২৫ বছর পর্যন্ত রস দিয়ে থাকে। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছ থেকে দৈনিক  ৮-১৪ লিটার রস পাওয়া যায়। তবে খেজুর রসের পরিমাণ গাছ ছিলার কৌশল ও যত্নের উপর অনেকটা  নির্ভর করে। 

গত কয়েক বছরে এ দেশ থেকে অনেক খেজুরের গাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে খুলনা, বরিশাল, যশোর, ফরিদপুর, মধুপুরে অনেক খেজুরের গাছ দেখা যায়। সব অঞ্চলে কম বেশি খেজুর গাছ থাকলেও গাছির অভাবে মিলছে না রসের দেখা। নগরায়ণের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গাছিরা। যারা আছে তারা রস ও গুড় বিক্রি করে তাদের সংসার চালাতে পারছে না। তাই এ ব্যবসার প্রতিও তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই । ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল থেকে গাছি আর রস দুটিই বিলুপ্ত হয়েছে। এক সময় গ্রামের প্রায় সব মানুষ শীতের সকালে বাজার করতে গিয়ে প্রথমেই যেখানে এক গ্লাস খেজুরের রস খেয়ে প্রাণটাকে ঠাণ্ডা করে বাজার শুরু করত, এখন গ্রামেও সেই দৃশ্য দেখা যায় না বললেই চলে। তা ছাড়া এক দশক আগেও গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে খেজুরের রস বিক্রি একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল, আর এখন বাজারে পর্যন্ত খুব একটা রসের দেখা মেলে না। এখনো খেজুরের রসের চাহিদা থাকলেও আগের সেই আগ্রহ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।


Share with :

Facebook Twitter